ডিজিটালের দৌরাত্ম্যে প্রিন্ট মিডিয়ার ধস!

প্রকাশিত: ১১:৪১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৪, ২০২১

ডিজিটালের দৌরাত্ম্যে প্রিন্ট মিডিয়ার ধস!

মারুফ হোসেন : প্রিন্ট মিডিয়ার আগের সেই জৌলুস আর নেই। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে পত্রিকা প্রকাশনার সাথে জড়িতদের। বরিশাল তথা বিশ্বজুড়ে সেই আলামত স্পষ্ট। কিন্তু কেন এই অবস্থা প্রিন্ট মিডিয়ার এবং কারাই বা এর জন্য দায়ী? ডিজিটাল প্লাটফর্মের দ্রুত উত্থানে খবরের কাগজের রাজস্ব আয়ে ধস নেমেছে। বিকল্প এই মাধ্যমের তোড়ে ছাপা পত্রিকার ভেসে যাওয়ার উপক্রম! বর্তমানে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত বিজ্ঞাপনের বড় অংশের ভাগ বসাচ্ছে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগোল। অথচ ছাপা পত্রিকার আয়ের প্রধান উৎসহ এই বিজ্ঞাপন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সব পত্রিকা বেকায়দায় দিন পার করছে।

এতদিন ছাপা পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল রেডিও-টেলিভিশন। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং সার্চ ইঞ্জিন নতুন আঙ্গিকে হয়ে উঠেছে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। বিজ্ঞাপনদাতারা বিকল্প মাধ্যমের দিকেই ঝুঁকছেন বেশি। ডিজিটাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে খুব সহজে লাখ লাখ মানুষের কাছে অল্প সময়ে পৌঁছানো সম্ভব বিধায় বিজ্ঞাপনদাতাদের এই বাঁকবদল।

‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে মহামারী করোনার অভিঘাতে ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থায় গণমাধ্যমকর্মীদের ছাঁটাই বেড়েছে। মহামারীতে বরিশালসহ বাংলাদেশের অনেক সংবাদমাধ্যমের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন এবং এ প্রক্রিয়া অব্যাহত। করোনাকাল সৃষ্ট ‘নতুন স্বাভাবিকের’ ঘূর্ণিস্রোতে সাংবাদিকরা অসহায়ভাবে ঘুরপাক খাচ্ছেন। অবশ্য সরকার কর্মহীন সাংবাদিকদের জন্য প্রনোদনার ব্যবস্থা করেছেন কিন্তু এখনও মাঠ পর্যায়ের মূলধারার অনেক সাংবাদিকই সেই প্রনোদনা থেকে বঞ্চিত। খবরের কাগজের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর বিশ্বাসযোগ্যতা। এখনো ছাপা পত্রিকার খবর সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য উৎস। এর পরই রয়েছে বেতার।

গণমাধ্যম পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অরম্যাক্স মিডিয়ার সাম্প্রতিক এক জরিপে এমন তথ্যই জানানো হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতার সূচক অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ মানুষ ছাপা পত্রিকার খবর বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন। ৫৭ শতাংশ বেতারের খবরে। আর ৫৬ শতাংশ টিভির খবরে আস্থা রাখে। দেখা যাচ্ছে, বিশ্বাসযোগ্যতার দিক দিয়ে ছাপা পত্রিকার স্থান প্রথম। অন্য দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ও কল্প কাহিনীর মধ্যে পার্থক্য করাটা সম্প্রতি কঠিন হয়ে উঠেছে। ভুয়া খবর যেভাবে বাড়ছে, তা-ও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। অরম্যাক্সের জরিপের এমন তথ্য ছাপা পত্রিকার সাংবাদিকদের জন্য মস্তবড় একটি সুসংবাদ।

নামে-বেনামে অসংখ্য অনলাইন পত্রিকা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বরিশাল সহ আমাদের দেশে। এসব অনলাইন নিউজপ্রোর্টালগুলো বেশিরভাগ সময়ই মূলধারার অনলাইন গণমাধ্যমের সংবাদ হবহু কপি-পেষ্ট করে প্রকাশ করছেন। আর তাদের মূল হাতিয়ার হলো ফেইসবুক। ফেইসবুকের মাধ্যমে তারা তাদের তথ্যহীন সংবাদ সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে থাকে। গত কয়েকদিন আগে বরিশালের স্থানীয় এক ইউপি নির্বাচনের সময়ে নিবন্ধনহীন একটি অনলাইন পত্রিকার একটি নিউজ দেখলাম। নিউজটির হেডিং ছিলো অনেকটা এমন ‘ওমুক ইউনিয়নে মেম্বার পদে এগিয়ে ওমুক’। প্রতিবেদনটি ওই অনলাইন প্রোটালের ফেইসবুক পেইজে পোষ্ট করা হয়েছে এবং সেই পেইজ থেকে পোষ্টটি বুষ্ট করা হয়েছে। এখানে অবাক করা বিষয় হলো ওই পেইজের লাইক দেখলাম মাত্র ৪৪৬টি অথচ ওই পোষ্টে লাইক দেখলাম ১ হাজার ২টি।

এভাবেই সংবাদপত্রের নীতিমাল থেকে বের হয়ে ডিজিটাল প্লাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে অর্থের বিনিময়েও কাজ করছেন অনেকে। সব কিছুর পর এ কথা বলা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে ছাপা পত্রিকার এখন দুর্দিন চলছে এটি সত্যি, কিন্তু এরপরও দিন শেষে খবরের কাগজের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনের প্রতি পাঠকের এই যে আস্থা, তাতে আগামী দিনেও প্রিন্ট মিডিয়া বহাল তবিয়তে থাকবে এটাই মূলধারার গণমাধ্যমের বাস্তবতা। তবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে যারা সংবাদমাধ্যমের তকমা লাকিয়ে অনৈতিক কাজ করে বেড়াচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জোড় দাবী মূলধারার গণমাধ্যমের প্রকাশনার সাথে জড়িতদের।

লেখকঃ অর্থ সম্পাদক, বাংলাদেশ সম্পাদক ফোরাম বরিশাল ও প্রকাশক-সম্পাদক, দৈনিক আজকের তালাশ।